রিভেঞ্জ অব ন্যাচার’ বা ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ এটি কোনো অলৌকিক কল্পকাহিনি নয়, বরং মানবসভ্যতার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি বাস্তব উপলব্ধি। মানুষের সীমাহীন লোভ, অবিচার, শোষণ ও প্রকৃতিবিরোধী কর্মকাণ্ড যখন একটি সীমা অতিক্রম করে, তখন প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এই প্রতিক্রিয়াই নানা সময় ভয়াবহ রূপ নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হয়। মানুষ সভ্যতার অগ্রগতির নামে প্রকৃতিকে জয় করার ঘোষণা দিয়েছে বহু আগেই। কিন্তু সেই ‘জয়’ আসলে ছিল বন উজাড়, পাহাড় কাটা, নদী ভরাট, বায়ু ও পানি দূষণ, এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এক দীর্ঘ ইতিহাস। ফলস্বরূপ প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার ওপর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ কিংবা ঘূর্ণিঝড়—এসব দুর্যোগের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে বৈশ্বিক মহামারীগুলোও মানুষের পরিবেশ ধ্বংস, বনাঞ্চলে অনুপ্রবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ ধারণাটি আরও গভীর অর্থ বহন করে। এটি বোঝায়—প্রকৃতি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেয় না, বরং মানুষ নিজেই নিজের কর্মফলের মুখোমুখি হয়। সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়ন যখন বাড়ে, তখন তার প্রভাবও কেবল সামাজিক কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পরিবেশ ও মানবিক নিরাপত্তাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। লোকজ বিশ্বাসে একে বলা হয় ‘রুহের হায়’ বা ‘অদৃশ্য ঋণ’। অর্থাৎ, কেউ যদি ক্ষমতার জোরে অন্যকে বঞ্চিত করে, দুর্বলকে দমিয়ে রাখে বা প্রকৃতিকে লুটে নেয়, তবে সেই ঋণ একদিন ফিরেই আসে। সময়, স্থান ও রূপ বদলালেও ফলাফল এড়ানোর কোনো উপায় নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল প্রচলিত “প্রকৃতি ক্ষমা করে না” বা “কর্মফল অনিবার্য” এ ধরনের বাক্যগুলো মূলত মানুষের এই সম্মিলিত অভিজ্ঞতারই ভাষাগত প্রকাশ। এগুলো কেবল আবেগী বক্তব্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার প্রতিফলন।
আজকের পৃথিবী আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতে নয়, সহাবস্থানে টিকে থাকতে হবে। উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তা ন্যায়, মানবিকতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অন্যথায়, যে মূল্য মানুষকে দিতে হবে, তা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর দায় বহন করবে পুরো মানবসভ্যতা।
সংক্ষেপে, ‘রিভেঞ্জ অব ন্যাচার’ আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং তারই একটি অংশ। সেই সত্য অস্বীকার করলে প্রকৃতির প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবেই আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
মনজিলা ঝুমা ,আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।