বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। ভোটার তালিকায় নারী ভোটারের সংখ্যাও প্রায় পুরুষের সমান—কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় যা অর্ধেকেরও বেশি। সে হিসেবে প্রার্থী নির্বাচন ও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে নারী ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারী ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হবে।
তবু বাস্তবতা হলো—এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিফলিত হচ্ছে না। প্রার্থী হওয়া, নির্বাচিত হওয়া এবং নীতিনির্ধারণের জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত সীমিত। সংখ্যাগত শক্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার এই বৈপরীত্য আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।
মনোনয়ন তালিকায় নারীর হতাশাজনক উপস্থিতি
২৪ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘোষিত মনোনয়ন ও প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী প্রার্থীর সংখ্যা এখনো হতাশাজনকভাবে কম। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে মোট প্রার্থীর তুলনায় নারী প্রার্থীর হার এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ। কোনো কোনো দলের ক্ষেত্রে তা ৫ শতাংশেরও কম, আবার কোথাও একজন নারী প্রার্থীও নেই।
দলভেদে সংখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক চিত্র একটাই—নারীরা এখনো প্রার্থী তালিকায় প্রান্তিক অবস্থানেই রয়ে গেছেন। এটি রাজনৈতিক দলে বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন।
পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নেতৃত্বকে এখনো শক্তি, কর্তৃত্ব ও পুরুষত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। ফলে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে অনেক সময় স্বাভাবিক না ভেবে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অথচ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্যায়ে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। বর্তমানে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদে বহু নারী সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শিক্ষা, আইন, প্রশাসন ও নাগরিক আন্দোলনেও আত্মবিশ্বাসী নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠছে—যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
প্রতীকী অংশগ্রহণ, বাস্তব ক্ষমতার অভাব
অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে নারী উইং, কোটা বা সংরক্ষিত পদ থাকলেও তা বাস্তব ক্ষমতায়নের প্রতিফলন নয়। দলীয় মনোনয়ন, নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের উপস্থিতি সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে নারী নেত্রীদের ব্যবহার করা হয় কেবল প্রচারমূলক কার্যক্রমে, কিন্তু সিদ্ধান্তের টেবিলে তাদের স্থান নিশ্চিত করা হয় না।
নারী রাজনীতিবিদদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি আলোচিত হয় তাদের ব্যক্তিগত জীবন, আচরণ বা পারিবারিক পরিচয়—যা পুরুষ রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে গেঁথে থাকা বৈষম্যেরই প্রমাণ।
অর্থনীতি, সহিংসতা ও সামাজিক বাধা
রাজনীতি একটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। নির্বাচনী ব্যয়, কর্মী ব্যবস্থাপনা ও প্রভাব বিস্তারে অর্থ একটি বড় নিয়ামক। অধিকাংশ নারী অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকায় এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ও রাজনৈতিক হয়রানি—কটূক্তি, অনলাইন আক্রমণ, সামাজিক অপমান এবং কখনো শারীরিক সহিংসতা। পর্যাপ্ত দলীয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অভাবে অনেক যোগ্য নারী রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। সমাজ এখনো নারীকে ‘সমর্থক’ বা ‘সহযোগী’ ভূমিকায় কল্পনা করে, নেতৃত্বের কেন্দ্রে নয়—যা দৃষ্টিভঙ্গিগত বড় বাধা।
সংরক্ষিত আসন: প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়
সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়াতে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় সংরক্ষিত আসনের নারীরা অনেক সময় স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন না। ফলে সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও প্রকৃত ক্ষমতায়ন প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।
প্রকৃত ক্ষমতায়ন: করণীয় কী
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন মানে শুধু কোটা বা উপস্থিতি নয়—নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্বে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সরাসরি নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তব সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গণমাধ্যমে নারী নেতৃত্বের ইতিবাচক উপস্থাপন এবং পরিবার ও সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—এই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি সম্ভব নয়।
উপসংহার
নারীর ভোটার শক্তি রাজনৈতিক প্রচারণায় গুরুত্ব পেলেও তা এখনো প্রার্থীত্ব ও ক্ষমতার কাঠামোতে রূপ নিতে পারেনি। এটি শুধু নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংকট নয়—এটি আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দুর্বলতা।
যেখানে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী ভোট দেয়, সেখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আসনে অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই গণতন্ত্র কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। নারী কেবল ভোটার নন—তিনি রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। এখন সময় এসেছে নারীর প্রতিনিধিত্বকে সংখ্যায় নয়, ক্ষমতা, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিশ্চিত করার।
লেখক: মনজিলা ঝুমা
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
কেন্দ্রীয় সংগঠক (দক্ষিনাঞ্চল), জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি

